উপস্থিত বুদ্ধির কার্যকারিতাঃ-আরিফুল ইসলাম আশিক

এই গল্পটি আজ থেকে অনেক দিন আগের। কোনো এক গ্রামে একজন কৃষক বাস করত। বুঝতেই পাড়ছেন কৃষকের অবস্থা কেমন হতে পাড়ে! সেই কৃষক স্থানীয় এক জমিদারের কাছে অনেক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কৃষক পরিবার এমনিতেই দিন আনতে পান্তা ফুরোয়, ঋণ পরিশোধ করা তো দূরের কথা। কৃষকের একমাত্র সম্পদ বলতে যা ছিল তা হল তার চাঁদের মত উজ্জ্বল সুন্দর দেখতে একটি মেয়ে আর তার দুই বিঘা জমি।

ঋণ  শোধ করতে না পারায় এর পরিবর্তে সেই জমিদার কৃষকের মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। যে জমিদারের মাথার চুল একদম সাদা হয়ে গিয়েছে আর কয়েক বছর পড় ইহলোক ছেড়ে পরলোকে গমন করবেন, তার আবার শক অনেক, ভাবা যায়! কেবলমাত্র বৃদ্ধই নয়, সেই জমিদার দেখতেও অনেক খারাপ আর বদমেজাজী ছিলেন।

বুড়ো জমিদার কৃষকের সুন্দর মেয়ের স্বপ্নে বিভোর হতে থাকে, একদিন আর থাকতে না পেরে তিনি গেলেন কৃষকের বাড়ি, সরাসরি কৃষককে তার মেয়ের সামনেই বললেন- “তোমার অনেক ঋণ  পড়ে আছে, আমি জানি তুমি পরিশোধ করতে পাড়বে না, এক কাজ করো তোমার রূপবতীকে আমার সাথে বিবাহ দিয়ে দাও এর পরিবর্তে তোমার সব ঋণ  মুকুব করে দিব।“ এই কথাটি শোনা মাত্রই কৃষক ও তার মেয়ে অবাক হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে জমিদারের দিকে তাকিয়ে থাকে।

বাংলা শিক্ষণীয় ছোট গল্প MOTIVATIONAL STORY

এরপর জমিদার বলে- “ আচ্ছা তাহলে এক কাজ কর, চল তোমরা আমার সাথে পঞ্চায়েতের কাছে। যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তিনিই নেবেন, আর তা আমাদের মানতে হবে।“ বাধ্য হয়ে কৃষক ও তার মেয়ে পঞ্চায়েতের কাছে গেলেন। আগাগোড়া সব কথা শোনার পড় পঞ্চায়েতও চিন্তায় পড়ে গেলেন।

এরপর পঞ্চায়েত বললেন- “আপনাদের সমস্যাটি আমাকে বড়ই চিন্তিত করছে, আচ্ছা আমি এই বিচারটি ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলাম। তোমাদের সামনে যে কালো আর রঙ্গিন বল গুলি দেখা যাচ্ছে, সেখান থেকে জমিদার একটি কালো আর একটি রঙ্গিন বল নিয়ে আমার কাছের এই ব্যাগে রাখবে, আর কৃষকের কন্যাকে না দেখে এই ব্যাগ থেকে যেকোনো একটি বল উঠিয়ে নিতে হবে। যদি সে কালো বল উঠায় তাহলে তাকে জমিদারকে বিয়ে করতে হবে আর পরিবর্তে জমিদার কৃষকের সব ঋণ  মুকুব করে দিবেন।

https://www.prothomalo.com/entertainment/song/m6wgtv0apb

আর সে যদি রঙ্গিন বল উঠায় তাহলে জমিদারকে বিবাহ করতে হবে না, এবং জমিদারের অবিবেচনা প্রসুত চিন্তা-ভাবনার জন্য জমিদারকে কৃষকের ঋণ  মুকুব করে দিতে হবে। আর কৃষকের কন্যা যদি কোনো বল না উঠায় তাহলে তার পিতাকে আজীবনের জন্য জেলে বন্দী করা হবে।

জমিদার রাজী হয়ে যায় এবং তাদের সামনে পড়ে থাকা বল গুলি থেকে পঞ্চায়েতের অগোচরে দুটি কালো বল উঠিয়ে থলির মধ্যে রেখে দেয়, সে ভেবেছিল দুটি বলই যদি কালো দেওয়া হয় তাহলে কৃষকের মেয়েকে বিবাহ করার ব্যাপারে সে নিশ্চিন্ত। কিন্তু তার এই চালাকি কৃষকের মেয়ে দেখে নেয়, সে ভাবতে থাকে কিভাবে এর সমাধান করা যায়।

এরপর সে উপস্থিত সবাইকে জমিদারের চালাকি বলে দিতে চাইল, কিন্তু সে আবার ভাবল সে যদি এটি বলে দেয় তাহলে, পড়ে আবার ব্যাগে বল রাখা হবে আর তখন রঙ্গিন এবং কালো দুটি বলই থাকবে, কিন্তু এখন দুটি বলই কালো তাহলে এর থেকে আরামেই বাঁচা যেতে পাড়ে।

শিক্ষণীয় মোটিভেশনাল গল্প। শিক্ষামূলক গল্প (motivational story)

এরপর পঞ্চায়েতের নির্দেশে সে ব্যাগটিতে হাত দিল এবং একটি বল হাঁতে নিয়ে কায়দা করে ইচ্ছে করেই নীচে থাকা বল গুলির উপর সেই বলটি সে ফেলে দিল। এরপর সে বলল- “ হে ভগবান, বল টিতো পড়ে গিয়ে বাকি বলগুলোর সাথে মিশে গেল, এবার কি হবে?”

পঞ্চায়েত বললেন- “যে বলটি নীচে পড়ে গেছে সেটিই তুমি তুলেছ, তাহলে দেখ ব্যাগে কি রঙের বল আছে, যে রঙের বলটি নেই সেটিই তুমি তুলেছ। এরপর সবাই দেখল যে ব্যাগে কালো রঙের বলটি পড়ে আছে। তাই সবাই ধরে নিল যে, কৃষকের কন্যা রঙ্গিন বলটি তুলেছে। তাই শর্ত সাপেক্ষে জমিদার কৃষকের সব ঋণ  মুকুব করে দিতে বাধ্য হল এবং কৃষকের কন্যাও বেঁচে গেল।

এদিকে জমিদারের চালাকি তারই পায়ে কুড়ুল মেরে চলে গেল।

এই গল্পটি থেকে যা কিছু শেখা যায়- সবসময় চতুরের চালাকি ধরিয়ে দিতে নেই, সব বুঝেও ঠাণ্ডা মাথায় কাজ হাসিল করে নিতে হয়। বেশি চলাকি করতে গেলে অবশেষে নিরাশ হতেই হবে।

গল্পটি শেয়ার করে দিন……………………………..

মূল্যবান কিছু দরকারী কথা

যার বিয়ে হয়েছে, সে বলছে ‘বিয়ে করাটাই তার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো। কেন যে করতে গেলাম!’ আর যারা বিয়ে করেনি, তারা দিনরাত বিয়ে নিয়ে মহাস্বপ্নের জাল বুনে চলেছে।
.
.
যার বাচ্চা আছে, সে ‘বাচ্চাদের জালায় অস্থির হয়ে যাচ্ছি’ বলে দিনরাত অভিযোগ করছে। যার বাচ্চা নেই, সে একটা বাচ্চার জন্য দিনরাত কেঁদেকেটে মরছে।
.
যার চাকরী আছে সে বলতেছে, চাকরি করা পেইন। প্রতিদিন এক জায়গায় যাওয়া আর একই কাজ করা কি যে বোরিং! আবার, যার চাকরি নাই সে বলতেছে চাকরির অভাবে অনেক কষ্টে আছে।
.
.
.
যার সন্তান পড়াশুনা করতে বিদেশ চলে যাচ্ছে, সে ভাবছে অমুক সাহেব আর যাই হোক, অন্তত সন্তানদের চাইলেই দেখতে পাচ্ছে। আর আমি আমার সন্তানকে চাইলেও দেখতে পারছিনা। আবার যারা সন্তানকে সবসময় কাছে পাচ্ছে, তাদের আফসোস হলো সন্তানগুলোকে এত কষ্ট করে পড়াশুনা করালাম! অমুকের মাথামোটা ছেলেটা পর্যন্ত স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে গেলো, আর আমার ছেলেটা কিনা এখনো দেশেই পড়ে আছে! বিদেশ যাওয়ার কোন ইচ্ছাই নাই! হায়রে কপাল! এত কষ্ট করে এজন্য পড়াশুনা করালাম?
.
.
যে ইন্ড্রাস্টিয়াল চাকরি করতেছে, সে বলতেছে টিচিং প্রফেশানই ভালো। অল্প পরিশ্রমেও অনেক টাকা কামানো যায়। যে টিচার সে বলতেছে, কেন শুরুতে ইন্ড্রাস্টিতে ঢুকলাম না, এতদিনে লাখ টাকা বেতন হতো। সারাদিন চিল্লায়ে চিল্লায়ে কথা বলতে বলতে গলা শেষ হয়ে গেলো।
.
.
যে বিদেশে আছে সে বলতেছে, দেশে একটা কোনমতে একটা চাকরি করে পরিবারের সাথে আরামে থাকতে পারতাম, হুদাই আসছি বিদেশে। যে দেশে আছে, সে বলতেছে অমুক অমুক বিদেশে গিয়ে কত মর্যাদার জীবন যাপন করতেছে, জীবনের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করতেছে, আর আমি হতভাগা কোনমতে ছোটখাট একটা জব নিয়ে বসে আছি।”
.
.
যার একটা নুন্যতম মাথা গুঁজার জন্য বাসা আছে, সে ভাবছে, ‘ধুর! একটা ফ্ল্যাটবাড়িই করতে পারলাম না! অমুক অমুক পর্যন্ত করে ফেললো! আর আমি এই এক পুরানা আমলের ঘর নিয়েই পড়ে থাকলাম সারাজীবন। আবার যে ফ্ল্যাটবাড়ি বানিয়েছে, সে একটা রাত শান্তিতে ঘুমানোর জন্য ছটফট করছে। অন্তরে একটু সুখ পাবার আশায় কত ব্যর্থ চেষ্টাই না করছে! মুভি, গান-বাজনা, সিরিয়াল, জোকস, ফানি ভিডিও কত কিছু! কিন্তু কোনটাই মনকে ভালোভাবে প্রশান্ত করতে পারেনা। সবগুলোই কিছুক্ষণ পর বিরক্তিকর হয়ে যায়। কোনটা দিয়েই অন্তরের অভাব দূর হয়না। লাখ টাকার বিছানায় শুয়ে একটু ভাল করে ঘুমাবে- সেটাও আসেনা। রিক্সাওয়ালার রিক্সায় ঘুমানো দেখে সে কেবল আফস্যোস করতে থাকে। ইশ! একটু যদি সুখ করে ঘুমাতে পারতাম!
.
.
আসলে প্রকৃত সুখে আছেটা কে?
.
কেউ নেই। দুনিয়া সুখে থাকার যায়গা না।
দুনিয়া হচ্ছে অনন্ত সুখের পাথেয় সংগ্রহ করার যায়গা। লবনাক্ত পানি দিয়ে পিপাসা মেটাতে চাইলে সেটা যেমন তৃষ্ণা না কমিয়ে উল্টা বাড়িয়ে দিবে, তেমনি দুনিয়াতে কেউ চিরসুখী হতে চাইলে সে কষ্টে-যন্ত্রনায় জর্জরিত হবেই।
.
দুনিয়াতে কেবলমাত্র সেই সুখে আছে, যে সাধ্যমত নিজেকে জীবনের সবক্ষেত্রে আল্লাহর দাসে পরিণত করতে পেরেছে। পরকালের জন্য সত্যিকারভাবে কিছু করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অন্তরের অভাব মেটাতে রব্বে কারীমের কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে। সুখের মালিকের কাছে, তার দেয়া সকল বিধি বিধানের কাছে নিঃশর্ত আত্নসমর্পণ করাতেই আছে আসল সুখ।
.
বারবার পা পিসলে যায়, কিন্তু তবুও রব্বে কারীমকে সন্তুষ্ট করার জন্য অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মানুষেরাই প্রকৃতভাবে সুখে আছে। যেটাকে ইমাম ইবনে কাইয়্যিম (র) “দুনিয়ার জান্নাত” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
.
.
বাদবাকি সবাই কমবেশি কেবল অন্যদেরকে সুখী মনে করে আফসোস করে আর ভেতরে ভেতরে জলেপুড়ে মরে। আর এই আফসোস, একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই প্রতিযোগিতা মৃত্যু পর্যন্তই। রুহটা চলে গেলেই সব খ ত ম।
.
.
“যেদিন তারা এটা(বিচার দিবস) প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা পৃথিবীতে একটি সন্ধ্যা অথবা একটি সকালের অধিক অবস্থান করেনি”-
(সূরা আন নাজিয়াতঃ ৪৬)
.
.
যারা একটি সন্ধ্যা বা একটি সকাল সুখে থাকার মোহে অনন্ত আখিরাতের জীবনের ব্যাপারে গাফেলতি করবে, পাথেয় সংগ্রহ করবেনা, তারা দুনিয়াতেও সুখ পাবেনা। আখিরাতেও না।
.
আর হাজার মাথাকুটে মরলেও রিযিকে যা আছে তার চেয়ে একচুলও বেশি পাবেনা, ইন শা আল্লাহ্‌। বরং অন্যান্য সবকিছু বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে।

Continue reading

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সন্তোষ রবিদাস তার চা শ্রমিক ‘মা’ কে নিয়ে আবেগঘন এই লেখাটি লিখেছেন

সন্তোষ রবিদাস অঞ্জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মৌলভীবাজার জেলার শমসেরনগরে ফাঁড়ি কানিহাটি চা-বাগানের এক চা শ্রমিক পরিবারের ছেলে আমি। জন্মের ছয় মাসের মাথায় বাবাকে হারিয়েছি। মা চা-বাগানের শ্রমিক। তখন মজুরি পেতেন দৈনিক ১৮ টাকা।

সেই সময় আমাকে পটের দুধ খাইয়ে, অন্যের বাসায় রেখে মা যেতেন বাগানে কাজ করতে।

২০০৭ সালে আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। মায়ের মজুরি তখন ৮৮ টাকা। এক দিন বললেন, ‘বাজারে গিয়ে পাঁচ কেজি চাল নিয়ে আয়।’ সেই চাল দিয়ে এক মাস চলেছে আমাদের। পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে দেখি মা চাল ভাজলেন। পলিথিনে সেই ভাজা চাল, আটার রুটি আর লাল চা একটা বোতলে ভরে গামছায় প্যাঁচালেন। আর আমাকে আটার রুটি ও লাল চা দিলেন। দুপুরে খেতে গিয়ে দেখি শুধু পেঁয়াজ, শুকনা ভাত, তেল আর লবণ আছে। তা দিয়ে মেখে খেলাম। রাতেও কোনো তরকারি ছিল না। তখন পাশের বাসার কাকু আমাকে ডেকে কুমড়া আর আলু দিয়েছিলেন, যা দিয়ে আমরা দুইটা দিন পার করেছিলাম। তখন কুপি বাতির আলোয় পড়তাম। মা আগেই রেডি করে দিতেন বাতি। তেল শেষ হয়ে গেলে আর পড়া হতো না। দোকানদার বাকিতে তেল দিতেন না।



পঞ্চম শ্রেণির পর ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলে পাঁচ বছরের জন্য ফ্রি পড়ালেখার সুযোগ পাই। মা অনেক খুশি হয়েছিলেন। তখন তাঁর সামান্য আয়ের একটা অংশ থেকে আমাকে টিফিন খাওয়ার জন্য প্রতি সপ্তাহে ৭০-৮০ টাকা দিতেন।

২০১৩ সালে বিএএফ শাহীন কলেজে ভর্তি হই। তখন মা ১০২ টাকা করে পেতেন। এই সময়ে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কিস্তি তুলে আমার ভর্তির টাকা, ইউনিফর্ম আর বই-খাতা কিনে দিয়েছিলেন।

২০১৪ ডিসেম্বর। মায়ের হাতে টাকা নেই। তখন এইচএসসির রেজিস্ট্রেশন চলছিল। মা ৫০ টাকার একটা নোট দিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন, ‘কেউ ধার দেয়নি রে বাপ।’ কলেজের এক শিক্ষকের কাছ থেকে ধার নিয়ে সেবার রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়েছিলাম।

এইচএসসির পর ভর্তি পরীক্ষার কোচিং। মা তখন আবার লোন নিলেন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে। লোনের কিস্তির জন্য এই সময় মা বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিনিময়ে পেতেন ৩০০ টাকা। আমি জানতাম ঘরে চাল নেই। শুধু আলু খেয়েই অনেক বেলা কাটিয়েছিলেন মা।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম। মা তখন কী যে খুশি হয়েছিলেন! কিন্তু ভর্তির সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, মায়ের মুখটা তত মলিন দেখাচ্ছিল। কারণ চা-বাগানে কাজ করে যা পান তা দিয়ে তো সংসারই চলে না। ভর্তির টাকা দেবেন কোথা থেকে। পরে এলাকার লোকজন চাঁদা তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সহায়তা করল। বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশনি করেই চলতাম। হলের ক্যান্টিনে ২০ টাকার সবজি-ভাত খেয়েই দিন পার করেছি। অনেক দিন সকালে টাকার অভাবে নাশতাও করতে পারিনি। দুর্গাপূজায় কখনো একটা নতুন জামা কিনতে পারিনি।


২০১৮ সালে শ্রেষ্ঠ মা হিসেবে উপজেলায় মাকে সম্মাননা দেওয়া হবে বলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জানানো হয়। পরে মায়ের নামটা কেটে দেওয়া হয়েছিল। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, মা আমার চা শ্রমিক। স্টেজে উঠে নাকি কিছু বলতে পারবেন না। তাই নাম কেটে দিয়েছে! মা এখনো প্রতিদিন সকালে একটা বোতলে লবণ, চা-পাতা ভর্তা, আটার রুটি, সামান্য ভাত পলিথিনে ভরে নিজের পাতি তোলার গামছায় মুড়িয়ে নিয়ে দৌড়ান চা-বাগানে। আট ঘণ্টা পরিশ্রম করে মাত্র ১২০ টাকা মজুরি পান! এই মজুরিতে কিভাবে চলে একজন শ্রমিকের সংসার? আজকাল মায়ের শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। বলেন, ‘তোর চাকরি হইলে বাগানের কাজ ছেড়ে দেব।’

আমি এখন সেই দিনের প্রতীক্ষায় আছি….!

– সন্তোষ রবিদাস অঞ্জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ছেলেকে বড় বানাতে গিয়ে, মানুষ বানাতে পারিনি।

সুরাইয়া শারমিন,

আমি একজন বিধবা মহিলা আমার বয়স এখন ৬০ বছর। আমি স্কুল শিক্ষিকা ছিলাম।
আমার একটা-ই ছেলে যার বয়স এখন ৩৬ বছর। ওর নাম আশিক আদনান দিপ ও থাকে অষ্ট্রেলিয়া। আমার হাজবেন্ড যখন মারা যায় তখন আমার বয়স ৪০ বছর। আর আমার ছেলে আশিক আদনান দিপ যাকে আমি দিপ বলে ডাকি ওর বয়স তখন ১৬ বছর।

ছেলে কে আমি একা একা বড় করেছি। নিজে কষ্ট করেছি, কখনো ছেলেকে কোন কিছুর অভাব বুঝতে দেই নাই। সব সময় চেয়েছি ওর সব চাহিদা মেটাতে। কখনো যেন না ভাবে – আমার বাবা থাকলে এ-ই চাহিদাটা পূরণ হতো। বাবা নাই বলে এটা পাচ্ছি না। ছেলে কে দেশের সব চাইতে ভালো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়িয়েছি। তারপর ছেলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে চলে গেলো অষ্ট্রেলিয়া । সব খরচ একা হাতে সামলিয়েছি। নিজের দিকে একদম খেয়াল করিনি। সব সময় দেখতে চেয়েছি আমার সন্তানের সফলতা ! তার ভবিষ্যৎ উজ্জল করাই ছিলো আমার জীবনের লক্ষ।আমাকে সবাই সফল মা বলেন।এই নিয়ে আমারও একধরনের চাপা গর্ব আছে।

গত সপ্তাহে আমার এক পুরাতন বান্ধবীর সাথে দেখা হলো ওর নাম লিপি। ওর ছেলে আমার ছেলে দিপের সাথে এক’ই স্কুলে পড়তো। ওর ছেলের সাথে অবশ্য দিপের খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিলো না। এর কারণ হয়তো আমি বা আমার ছেলে দিপ।

আমি সব সময় চাইতাম দিপ শুধু মাত্র ভালো স্টুডেন্ট যারা আর সব সময় পড়ালেখা নিয়ে কমপিটিশন করে তাদের সাথে মিশবে। তাতে করে ওর ভেতরে পড়ালেখার প্রতি আরো বেশি প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকবে।

সব সময় লিপি বলতো -দেখ আমরা দু’জন কত ভালো বন্ধু। আর আমাদের ছেলেরাও এক’ই স্কুলে পড়ে, তার পরেও ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব হলো না।
লিপির ছেলে আরিফ সব ক্লাসে টেনেটুনে পাশ করে যেতো। তবে সব সময়ই স্কুলের খেলাধুলা অন্যান্য কার্যক্রম গুলোতে অংশগ্রহণ করতো। স্কুলের ওয়াল ম্যাগাজিনে ওর লেখা থাকতো, ছবি আঁকতো, এগুলো নিয়েই লিপি খুশি থাকতো।

লিপির কথা,- আমার ছেলে’তো আর ফেল করে না! পাশ করে গেলেই হলো। সবার ছেলেতো ফাস্ট হবে না। আমার ছেলেটা পড়ালেখায় তেমন ভালো না কিন্তু ওর অন্য কাজ গুলো কত সুন্দর!
আমার কাছে লিপির এই কথা গুলো অসহ্য লাগতো। মনে হতো,ছেলের মাথায় তো গোবর আছে। তার চাইতে বেশি গোবর মায়ের মাথায়। তা না হলে যে ছেলে পড়ালেখায় এত পেছনে পরে আছে। তাকে কোন মা স্কুলের এক্সটা কার্যক্রম নিয়ে সময় নষ্ট করতে দেয়!
দিপ কলেজে উঠে নটরডেম কলেজে ভর্তি হলো আর আরিফ খুবই সাধারণ একটা কলেজে ভর্তি হলো। তার পর ওদের সাথে আর যোগাযোগ ছিলো না।

গত সপ্তাহে শপিং মলে ওদের সাথে দেখা হলো। তাও আমি ওদের দেখি নাই। আমাকে লিপির ছেলে আরিফ দেখতে পেয়ে আমার কাছে এসে বলে
-আন্টি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি আরিফ।
আমি আরিফকে আসলেই চিনতে পারছিলাম না। আরিফ কে যখন শেষ দেখি তখন মাত্র স্কুল ছেড়ে কলেজে যাবে। ছেলে মানুষি এখনো চোখে মুখে। আর এখন রীতি মতো ভদ্রলোক। তার পর আরিফ আমাকে লিপির কাছে নিয়ে যায়। লিপি একটা দোকানে বসা ছিলো। লিপিকে নিয়ে ওর ছেলে শপিং এ এসেছে। তাও আবার লিপির জন্য তার ছেলে পছন্দ করে কি সব রংচঙে থ্রী-পিছ কিনছে।

আমি আর লিপি সব সময় শাড়ি পরতাম, তাই আমি একটু অবাক হলাম। লিপি আমার কাছে বার বার জানতে চাইছিলো।
-তুই বল আমি কোনটা কিনবো আমাকে কোনটায় মানাবে?
-তখনই আরিফ হঠাৎ করে বলে বসে আন্টি আপনি যেটা পছন্দ করবেন আম্মা সেটাই কিনবে।তার পর আমি একটা থ্রী- পিস পছন্দ করি আরিফ সেই একই থ্রী- পিস দুইটা কিনে আমি তা খেয়াল করি।
আমি আর লিপি গল্প করছিলাম কেনাকাটার ফাঁকে ফাঁকে ।
তারপর আরো কিছু টুকিটাকি কেনাকাটা করে ওরা। ওদের কেনাকাটা দেখে মনে হচ্ছিল ওরা কোথাও বেড়াতে যাবে।
আমি আরিফ কে খেয়াল করছিলাম ও লিপির সাথে কেমন সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে। মনে হয় আরিফ ওর মাকে নয় মেয়ে কে নিয়ে বের হয়েছে শপিং করতে। তার পর আমাদের নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যায়।আরিফ টুকটাক খাবার অর্ডার করে শেষে আরিফ বলে –
আম্মা কফি খাবে নাকি কোন আইসক্রিম।
লিপি বলল আগে কফি খাব তারপর কোন আইসক্রিম খেতে খেতে বাসায় যাব।
আমি বললাম- আমি শুধু কফি।
লিপি সঙ্গে সঙ্গে বলল -তা হলে আইসক্রিম খাওয়া বাদ।
খেতে খেতে শুনলাম ওরা বেড়াতে যাচ্ছে কক্সবাজারে সেখান থেকে সেন্ট মার্টিন। সাথে লিপি কে নিয়ে যাবে। যদিও সেটা আরিফের অফিসিয়াল টুর।আরিফ একটা বায়িং হাউস এ আছে। বুঝতে পারলাম ভালো দায়িত্বে আছে। আমাদের সাথে বসা অবস্থায় কতবার যে মেইল চেক করলো। আর টুকটাক অফিসিয়াল কল রিসিভ করলো। তার মানে শত ব্যস্ততার মধ্যেও মা’কে শপিং করতে নিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে আরো জানা হয়ে গেলো আরিফের বউ-এর কথা আরিফের বউ একটা মাল্টি ন্যাশনাল কম্পানিতে আছে। তাদের এক সন্তান সে এখন তার নানি বাড়িতে আছে। শপিং শেষ হলে আরিফ তার মেয়ে কে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে তুলে নিবে।

আমি একটা বিছানার চাদর আর আমার জন্য টুকটাক বাজার করতে এসেছিলাম। আমি কিছুই কিনি নাই সেদিন। আমার কিছু কিনতে ইচ্ছে হচ্ছে না আর।আমি শুধু আরিফ কে দেখছিলাম। আরিফ কি ভাবে ওর মা’কে এত যত্ন করছে।স্যান্ডেলের দোকানে নিজে তার মায়ের পায়ে স্যান্ডেল পরিয়ে দিলো।লিপি এত দাম দিয়ে স্যান্ডেল কিনবে না। আরিফ তখন বলল আম্মা তুমি মূল্য দেখো কেন? তুমি দেখবে আরাম পাও কিনা?
আরিফের কত খেয়াল তার মায়ের জন্য। সব শেষে সানগ্লাস কিনলো মায়ের জন্য। লিপি সানগ্লাস কিনবে না।তখন আরিফ বলল,

  • মা সানগ্লাস কিনতে হবে কারন তুমি যখন সমুদ্রের ধারে হাটবে তখন তোমার চোখে রোদ লাগবে।
    ওদের মা – ছেলেকে দেখে আমার এমন লাগছে কেন? আমি আরিফ কে দেখছি, লিপিকে দেখছি। আর আমার ভেতরে কেমন হীনমন্যতা ঢুকে যাচ্ছে। বার বার মনে হচ্ছে আমি হেরে গেছি জীবনের কাছে। আমি একজন ব্যর্থ মা। যে তার ছেলেকে সব চাইতে সফল আর বড় বানাতে গিয়ে এত বড় বানিয়ে ফেলেছি যে, সেই ছেলের নাগাল আমি আর কখনো পাবো না!

এর মধ্যে কয়েকবার আরিফ দিপের কথা জানতে চেয়েছে।দিপের সাথে যোগাযোগের নম্বর চেয়েছে, আমি দেই নাই। বলেছি বাসায় আছে, নোট বইয়ে লেখা। আর দিপ আমাকে কল দেয় সব সময়। আমি তো দেই না তাই মনে নাই। আসলে দিপের অনুমতি না নিয়ে ওর নম্বর কাউকে দিলে ও রাগ করবে। আমাকেই বলে

  • মা আমি অনেক বিজি থাকি, যখন তখন কল দিবে না। এতে করে আমার ডিসটার্ব হয়। তুমি এখনো অষ্ট্রেলিয়া আর বাংলাদেশের সময়ে এডজাস্ট করতে পারো না কেন?
    আরিফ আমাকে আমাদের বাসায় নামিয়ে দেওয়ার সময় আমার হাতে একটা শপিং ব্যাগ দিয়ে বলল এটা আপনার জন্য। আমি দেখি ঠিক মিনার মতো আমার জন্যও একটা থ্রী-পিস কিনেছে আরিফ। আন্টি এটা আপনার জন্য।আপনারা দুই বান্ধবী এক সময় এক রকম জামা পরে বেড়াতে বের হবেন।
    আমার চোখে পানি চলে আসার অবস্থা হয়েছিলো তখন।
    আরিফ আরো বলল আন্টি আমার মোবাইল নং তো সেভ করে দিয়েছি আপনার যখন খুশি কল দিবেন, আমি এসে আপনাকে বাসায় নিয়ে যাবো। আমি তখন বললাম –
    তুমিও তো বিজি থাকো। তখন আরিফ বলল,
  • আন্টি আপনার জন্য আমি সব সময়ই ফ্রি আছি।
    তারপর আরো বলল,
    -আন্টি আপনি তো একা থাকেন আপনিও চলেন না আমাদের সাথে কক্স বাজার। আম্মা’র একজন সঙ্গী হবে। আম্মার আরো বেশি ভালো লাগবে।
    আমি মনে মনে কতক্ষন থেকে বলছি – লিপি আমাকে নিবি তোদের সাথে কক্স বাজার? আমি সমুদ্র দেখবো না। আমি শুধু দেখবো একজন ছেলে তার মা’কে কত আদর যত্ন করে তা।

আমি আরিফ কে বললাম,

  • আরিফ আসলেই ঠিক বলেছো।লিপির সাথে কতদিন পর দেখা আমার। আমারও ভালো লাগবে তোমাদের সাথে বেড়াতে গেলে। কিন্তু দিপকে তো বলতে হবে।আমি আজ দিপের সাথে কথা বলে তোমাকে জানাবো।
    লিপি মনে হয় আমার কথায় অবাক হলো। আমি এত সহজে ওদের সাথে যেতে রাজি হবো এটা লিপি ভাবতেও পারে নাই। লিপি। আমার হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
  • শাহী প্লীজ চল, আমার অনেক ভালো লাগবে।
    তার পর ওরা চলে গেলো। আমি আমার আলো-হীন ঘরে ঢুকে, আজ আরো বেশি অন্ধকার দেখতে পেলাম। গতকাল রাতের বেলা দিপের সাথে হওয়া কথা গুলো ভাবতে লাগলাম।
    দিপের বিয়ে দিপ একা-একা করলো অষ্ট্রেলিয়া, নিজে মেয়ে পছন্দ করলো আর যেহেতু মেয়েরা অষ্ট্রেলিয়া বহু বছর থেকে আছে। তাই বাংলাদেশে এসে বিয়ের করার প্রশ্নই আসে না। আমি টেলিফোনে ওদের আশির্বাদ করলাম। তার পর দেশে আসবে বলে আসলো না। তখন দিপের বউ-এর পড়ালেখা শেষ হয় নাই এর মধ্যে আসা যাবে না দিপের ছেলে হলো এখন ছেলে ছোট তাই বাংলাদেশের আবহাওয়া বাচ্চা’র সহ্য হবে না তা-ই আসা যাবে না। এবছর আমাকে অষ্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য সব কাগজ ঠিক করার কথা। গতকাল কল দিয়ে বলল, এবার ছুটিতে ওদের সবাই কে নিয়ে দিপের শ্বশুর শাশুড়ী সহ আমেরিকা যাবে। দিপ আমাকে কল দিয়ে বলল মা আমরা সবাই চেষ্টা করবো আগামী বছর দেশে আসার তুমি মন খারাপ করো না।

না আমি মন খারাপ করি নাই। আমি আজ আরিফ কে দেখে বুঝতে পেরেছি, শুধু ভালো ছাত্র আর সব সময় ফাস্ট হওয়া ছেলেরাই সেরা সন্তান হয় না। একজন সন্তান কে মানুষ করার ক্ষেত্রে আমি শুধু আমার ছেলেকে সেরাটা দিয়েছি। আর তাকে শিখিয়েছি ফাস্ট হতে হবে পরীক্ষার খাতায় আর চাকরির বাজারে।
সেরা মানুষ হতে হবে এটা আমি কখনো শেখাই নাই।আমি ওকে কখনো শেখাই নাই তোমার বন্ধুদের সহযোগিতা করবে। আমি শিখিয়েছি শুধু প্রতিযোগিতা।.

ওর কিসে ভালো হবে ওকে শিখিয়েছি। কিন্তু সবাইকে নিয়ে ভাবাটা শিখাতে পারি নাই।
আমি সব সময় দিপ কে ভালো জিনিস কিনে দিয়েছি। ওর চাহিদা পূরণ করেছি। কিন্তু আমি কখনো আমার কোন চাহিদা আছে বা থাকতে পারে তা ওকে দেখাই নাই।
আমি দিপকে কল দিবো না কক্স বাজার যাওয়া নিয়ে। এটা আরিফ কে বলার জন্য বলা। আজ লিপিদের সাথে দেখা হওয়ায় ভালো হলো। এখন থেকে আমি আমার ভালো লাগা মন্দ লাগা নিয়ে ভাববো। ছেলেকে নিয়ে আমার ভাবনা শেষ।
ছেলে কে তার ভালো থাকার জন্য সব করে দিয়েছি। ছেলের আর আমার কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নাই।
ছেলে আমাকে তার কাছে অষ্ট্রেলিয়া বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে, গত দুই বছর থেকে আমার চলার টাকা থেকে একটু একটু করে যথেষ্ট টাকা জমিয়েছি। ওদের জন্য কত কিছু কিনবো তাই।
এবার থেকে আমি আমার জীবনের ছোট ছোট চাওয়া গুলো পূরণ করবো।বাঁচব আর কটা দিন। খুব শখ ছিলো হিমালয় দেখবো আর মিশরের পিরামিড দেখবো! একা একা কি এগুলো দেখা যাবে? তার চাইতে এবার লিপির সাথে কক্সবাজার আর সেন্ট মার্টিন ঘুরে আসি তারপর একটু নিজেকে নিয়ে ভাববো।